
কৃতজ্ঞতার মহাকাব্য - আরিফ শামছ্
কৃতজ্ঞতার মহাকাব্য মানুষের জীবন মূলত এক দীর্ঘ সফর— জন্মের প্রথম কান্না থেকে মৃত্যুর শেষ নীরবতা পর্যন্ত, একটি অনন্ত পথচলা। এই পথের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি ধূলিধূসর প্রান্তরে, প্রতিটি আনন্দের প্রভাতে এবং প্রতিটি বিষাদের গোধূলিতে কিছু মানুষ এসে দাঁড়ান— কেউ আপন হয়ে, কেউ পর হয়েও আপন; কেউ রক্তের সম্পর্কে, কেউ আত্মার বন্ধনে; কেউ দৃশ্যমান উপস্থিতিতে, কেউ অদৃশ্য দোয়ার ছায়ায়। শৈশবের প্রথম পাঠশালা থেকে কৈশোরের স্বপ্নভেজা দিন, যৌবনের সংগ্রামমুখর সময় থেকে মধ্যবয়সের ক্লান্ত সন্ধ্যা, এমনকি মৃত্যুর পর স্মৃতির নিঃশব্দ প্রহর পর্যন্ত— যাঁরা আমাকে, আমাদেরকে, ভালোবেসেছেন, মহব্বত করেছেন, স্নেহে আগলে রেখেছেন, সম্মান ও মর্যাদায় হৃদয় ভরিয়ে দিয়েছেন, ভুলত্রুটি জেনেও ক্ষমার চোখে দেখেছেন, অসফলতায় হাত ছেড়ে না দিয়ে সফলতার জন্য দোয়ার হাত তুলেছেন— তাঁদের প্রতি রইল অন্তরের গভীরতম কক্ষ থেকে অসীম শ্রদ্ধা, নিঃশর্ত ভালোবাসা, অপরিসীম কৃতজ্ঞতা এবং বিনম্র সালাম। আসলে মানুষ কখনো একা বড় হয় না। একটি শিশুর প্রথম হাঁটার পেছনে থাকে মায়ের হাত, প্রথম উচ্চারণের পেছনে থাকে বাবার প্রার্থনা, প্রথম শিক্ষার পেছনে থাকে শিক্ষকের ত্যাগ, প্রথম সাহসের পেছনে থাকে বন্ধুর নির্ভরতা, প্রথম ব্যর্থতার পরে উঠে দাঁড়ানোর পেছনে থাকে কোনো এক নীরব শুভাকাঙ্ক্ষীর অদৃশ্য দোয়া। আমরা অনেক সময় ভাবি— আমি নিজেই আমার অর্জনের নির্মাতা। কিন্তু সত্য হলো— আমাদের প্রতিটি সফলতার পেছনে অনেক অদৃশ্য মানুষের অশ্রু, অনেক নীরব মানুষের ত্যাগ, অনেক অজানা হৃদয়ের ভালোবাসা নিভৃতে জড়িয়ে থাকে। আমি জানি না— ছোট-বড়, দেশি-বিদেশি, আত্মীয়-স্বজন, ভাই-বেরাদর, বন্ধু-বান্ধব, পথের সাথী, দূরের মানুষ, পরিচিত কিংবা অপরিচিত, দেখা কিংবা অদেখা— এত মানুষের এত নির্মল ভালোবাসা, সহযোগিতা, আন্তরিকতা এবং দোয়া পাওয়ার সামর্থ্য, যোগ্যতা কিংবা অধিকার আমার আদৌ আছে কি না। হয়তো নেই। হয়তো আমি সেই দাবির উপযুক্ত নই। তবুও মানুষ আমাকে ভালোবেসেছে— এটাই তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অলৌকিকতা। যারা বিনিময়ের আশা না করে নিঃস্বার্থ হৃদয়ে ভালোবেসেছেন, যারা আমার অনুপস্থিতিতেও আমার জন্য ভালো চেয়েছেন, যারা আমার পতনে উপহাস নয়, উত্থানের জন্য প্রার্থনা করেছেন, যারা দূরে থেকেও আপন থেকেছেন— তাঁদের জন্য আমার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন আজ কৃতজ্ঞতার ভাষা হয়ে উঠুক। আমি তাঁদের বলি— আপনারা আমার জীবনের অদৃশ্য আশ্রয়, আপনারা আমার ভাঙা পথের প্রদীপ, আপনারা আমার নিঃসঙ্গতার প্রার্থনা, আপনারা আমার জীবনের সেই অনুলিখিত কবিতা যার প্রতিটি পঙ্ক্তি আল্লাহর রহমতের মতো পবিত্র। তাই বিনম্র হৃদয়ে বলি— জাযাকাল্লাহু খাইরান। আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দান করুন। সুমহান আল্লাহ তাআলা, যিনি হৃদয়ের গোপন আর্তি জানেন, যিনি অশ্রুর শব্দও শুনতে পান, যিনি নীরব ভালোবাসার মূল্য সবচেয়ে ভালো বোঝেন— তিনি আপনাদের জীবন ভরে দিন রহমত, বরকত, সুস্থতা, শান্তি ও নূরে। ফেরেশতারা আপনাদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করুক, মানবজাতি আপনাদের সম্মান করুক, সমস্ত মাখলুকাত আপনাদের জন্য কল্যাণের সাক্ষ্য দিক। সুসময়ে, দুঃসময়ে, হাসিতে ও কান্নায়, প্রাপ্তিতে ও বঞ্চনায়, জীবনে ও মৃত্যুর পরে— আল্লাহ আপনাদের ভালোবাসুন, আল্লাহ আপনাদের রক্ষা করুন, আল্লাহ আপনাদের সাহায্য ও সহযোগিতা করুন। কারণ পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়— ভালোবাসা। সবচেয়ে বড় পরিচয় পদবি নয়— মানবতা। সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার সম্পত্তি নয়— দোয়া। আর সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য— কারো হৃদয়ে নিঃস্বার্থভাবে জায়গা করে নেওয়া। আমীন। ইয়া রাব্বুল আলামীন। কৃতজ্ঞতার মহাকাব্য। আর সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য— কারো হৃদয়ে নিঃস্বার্থভাবে জায়গা করে নেওয়া। আমীন। ইয়া রাব্বুল আলামীন। কৃতজ্ঞতার মহাকাব্য । ।

