
এক অসমাপ্ত প্রেম, এক দীর্ঘ আত্মযুদ্ধ ৩- আরিফ শামছ্
এক অসমাপ্ত প্রেম, এক দীর্ঘ আত্মযুদ্ধ ঊনিশ সাতান্নব্বই সাল। সময়ের ক্যালেন্ডারে এটি শুধু একটি বছর, কিন্তু আমার জীবনে— এটি এক অনন্ত শুরু, এক নীরব পতনের প্রথম দিন। আমি তখন স্বপ্নে ভরা এক কিশোর, বই ছিল সঙ্গী, কলম ছিল অস্ত্র, আর ভবিষ্যৎ ছিল আলো ঝলমলে এক প্রতিশ্রুতি। ক্লাস ওয়ান থেকে টেন— সবার মুখে এক নাম, “ফার্স্ট বয়”। পরিবারের আশা, এলাকার গর্ব, শিক্ষকদের বিশ্বাস— সব মিলিয়ে আমি ছিলাম এক সম্ভাবনার নির্মাণাধীন মিনার। তারপর তুমি এলে। না, ঝড়ের মতো নয়— বরং ফজরের আজানের মতো নীরবে, যা হৃদয়ে ঢুকে যায় কিন্তু শব্দ করে না। তোমার নাম—কবিতা। হয়তো নামটি বাস্তব নয়, কিন্তু অনুভূতিটা ছিল সবচেয়ে বাস্তব। তুমি জাননি, একটি সাধারণ হাসি কীভাবে একজন মানুষের বহু বছরের মনোযোগ ভেঙে দিতে পারে। তুমি জাননি, একটি না বলা ভালোবাসা কীভাবে একটি জীবনকে দুই ভাগে ভাগ করে দেয়— তোমার আগে, এবং তোমার পরে। মেট্রিক ভালো হলো, ইন্টারও। অনার্সে ভর্তি হলাম স্বপ্নের পতাকা হাতে নিয়ে। সবাই ভাবল— এই ছেলেটা অনেক দূর যাবে। কিন্তু কেউ জানত না, আমি ভিতরে ভিতরে অন্য এক পরীক্ষায় ফেল করছি। বই খুলতাম— তোমার মুখ ভেসে উঠত। নোট লিখতাম— শব্দের ভেতর তোমার নাম শুনতাম। রাত জাগতাম— পড়ার জন্য নয়, ভুলে থাকার ব্যর্থ চেষ্টায়। একবার থার্ড ক্লাস। তারপর আবার চেষ্টা— কষ্টে সেকেন্ড ক্লাস। ডিগ্রি হাতে ছিল, কিন্তু আত্মবিশ্বাস অনেক আগেই ভেঙে গিয়েছিল। মানুষ বলল— “সময় সব ঠিক করে দেয়।” মিথ্যে। সময় সব ঠিক করে না, সময় শুধু মানুষকে ব্যথার সঙ্গে বাঁচতে শিখিয়ে দেয়। আজ তুমি সুখে আছো— স্বামী, সন্তান, সংসার, পূর্ণ এক পৃথিবী নিয়ে। আমি দূর থেকে দেখি, এবং নিজের ভিতরে প্রশ্ন করি— “তাহলে আমি কেন এখনো আটকে আছি?” আমি বহুবার প্রতিজ্ঞা করেছি— আর না। আজ থেকে শেষ। আজ থেকে মুক্তি। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই দিনগুলোতেই তুমি আরও বেশি ফিরে আসো। যেদিন ভুলতে চাই, সেদিনই স্মৃতি দরজায় কড়া নাড়ে। যেদিন নিজেকে বাঁচাতে চাই, সেদিনই অতীত আমাকে ডুবিয়ে দেয়। এই কি প্রেম? নাকি এটি নিজের হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার শোক? হয়তো আমি তোমাকে নয়, হারিয়ে যাওয়া আমাকেই খুঁজি। যে আমি একদিন অনেক বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। যে আমি একটি নাম নয়, একটি ভবিষ্যৎ ছিলাম। নামাজে দাঁড়াই— মন ছুটে যায় তোমার দিকে। কুরআন খুলে বসি— চোখ পড়ে, মন পড়ে না। দুনিয়া ডাকে— আমি সাড়া দিতে পারি না। আখিরাত ডাকে— আমি লজ্জায় মাথা তুলতে পারি না। মনে হয় সবকিছু বরবাদ হয়ে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। তবু আমি জানি— আল্লাহ মানুষকে ভাঙার জন্য নয়, ফিরে আসার জন্য পরীক্ষা করেন। হয়তো আমার সবচেয়ে বড় জিহাদ এই হৃদয়ের ভিতরেই। যেখানে অন্য কেউ নয়, একটি পুরোনো নাম আমাকে বন্দী করে রেখেছে। আমি আজও দোয়া করি— হে আল্লাহ, যাকে আমার জন্য লিখেননি, তাকে আমার হৃদয় থেকেও মুছে দিন। যে স্মৃতি আমাকে আপনার থেকে দূরে নেয়, সেটিকে ইবাদতে বদলে দিন। যে ভালোবাসা আমাকে ভেঙে দিয়েছে, সেটিকে আপনার ভালোবাসায় পূর্ণ করে দিন। আমি তাকে চাই না আর— আমি নিজেকে ফিরে পেতে চাই। কারণ বুঝেছি— সব প্রেম মিলনের জন্য নয়, কিছু প্রেম শুধু মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আসে। আর যদি এ কষ্টই আমার হেদায়াতের দরজা হয়, তবে এ ব্যথাকেও আমি সিজদায় রেখে দেব। তুমি ভালো থেকো, কবিতা। আমি আর তোমাকে খুঁজি না— আমি এখন নিজের হারিয়ে যাওয়া আলোকে খুঁজি। তুমি ভালো থেকো, কবিতা। আমি আর তোমাকে খুঁজি না— আমি এখন নিজের হারিয়ে যাওয়া আলোকে খুঁজি।

