রাতের গভীরে, যখন সব শব্দ ধীরে ধীরে মাটির ভেতর ঢুকে যায়, তখনই যেন ভেসে ওঠে হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠগুলো। কারও মুখ নেই, ছবি নেই, শুধু শব্দের ছায়া—ভেজা মাটির গন্ধের মতো থেকে গেছে বাংলার বাতাসে। আমার পরদাদারও কোনও ছবি নেই। তাঁর বসে থাকার জায়গাটাও আজ অচেনা—কোন উঠোনে, কোন নদীর পাড়ে, না কি কোনও নিঃশব্দ মাটির ঘরে তিনি গুনগুন করে গান লিখতেন, তা কেউ জানে না। শুধু শোনা যায়—একটা পুরোনো খাতায় নাকি কিছু লাইন ছিল, কেউ একদিন দেখেছিল, তারপর সেটাও হারিয়ে গেছে। এই হারিয়ে যাওয়াই যেন বাংলার সুরের নিয়তি। যেমন একদিন হারিয়ে গেল অসংখ্য চর্যার পদ। যারা লিখেছিল, তারা ছিল পথের সাধক—নাম ছিল, আবার ছিল না। তারা গান লিখে রেখে গেছে, কিন্তু নিজেরা বাতাসের মতো মিলিয়ে গেছে। আজ আমরা শুধু শব্দ পাই, মানুষের মুখ পাই না। বাংলার মাটিতে এমন কত পদকর্তা জন্মেছেন— কেউ পাগল বলে পরিচিত, কেউ ফকির, কেউ নামহীন পথিক। তারা সংসারের হিসাব রাখেনি, শুধু সুরের ভিতর সত্য খুঁজেছে। তাদের কাছে গান ছিল প্রার্থনা, আর প্রার্থনা ছিল জীবন। ভাবুন, এক অচেনা গ্রাম। সন্ধ্যার পর আকাশে প্রথম তারা উঠেছে। একজন মানুষ, ছেঁড়া কাপড়, চোখে অন্য জগতের আলো—নিঃশব্দে বসে আছেন। হয়তো কেউ তাকে পাগল বলেছে, কেউ সাধক। কিন্তু তিনি জানেন—মানুষের ভেতর যে আলো জ্বলে, সেটাই তার গান। তিনি বলেন না—“আমাকে মনে রেখো।” তিনি শুধু বলেন—“সুরটাকে বাঁচিয়ে রেখো।” আজ যখন আমরা সেই পুরোনো গান গাই— “ফকির তুমি হতে পারো…” তখন মনে হয়, এ শুধু একটি গান নয়, এ এক দীর্ঘ যাত্রার প্রতিধ্বনি— যেখানে নামহীন কবিরা, হারিয়ে যাওয়া সাধকেরা, আর স্মৃতিহীন পূর্বপুরুষেরা একসাথে বসে আছেন। তাদের কারও ছবি নেই, ঠিকানা নেই, কিন্তু তাদের গান এখনো বাতাসে ভেসে থাকে। এই গান সেইসব মানুষের জন্য— যারা হারিয়ে গিয়েও রয়ে গেছে। যারা নেই, কিন্তু যাদের সুর এখনো আমাদের ভেতর জেগে ওঠে। চলুন, সেই অদেখা মুখগুলোর স্মরণে— গান শুরু হোক।